

ডেস্ক রিপোর্ট, ০৯মে: আমাদের দেশ থেকে মিঠা পানির অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ কালিবাউশ মনে হয় চিরতরেই হারিয়ে গেল। কালিবাউশ মাছ এক সময় আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকাতেই কম বেশি পাওয়া যেত। খালে-বিলে, হাওর-বাওর সহ নদী মোহনায়, মরা নদী এবং গৃহস্তের পুকুর এ সব এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যেত। কালের বিবর্তনে আজ ‘কালিবাউশ’ নামটাই শুধু মুরুবিবদের কাছে শোনা যায়। হালের বাজারে কালিবাউশ নামে যে মাছটি আমরা মাঝে মাঝে দেখি ওটা আসলে বাউশ গোত্রেরই জ্ঞাতি ভাই সাদা বাউশ (দক্ষিণাঞ্চলে নাইন্দাল নামে পরিচিত)। কালিবাউশ মাছটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি খেতেও সুস্বাদু। কুচ কুচে কালো, কানকোর নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত সুবিন্যস্ত দূরত্বে (২+২+১) পাঁচটি পাখনা, পিঠের উপর ঠিক মাঝ বরাবর শুরু হয়ে ক্রমশ পিছনের দিকে বিন্যস্ত লেজের সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ বড় পাখনা আর চোখ দুটো টকটকে লাল, দেখলে মনে হয় কেউ যেন পুঁতি দিয়ে চোখ বানিয়ে রেখেছে, মুখের নিচের চোয়ালে ২ থেকে ৪টা ছোট্ট গোঁফ। পরিষ্কার স্বচ্ছ পানিতে মাছটি খুব সুন্দর দেখায়। গ্রামের সাথে যোগাযোগ থাকায় এবং একটি বেসরকারি কোম্পানীর বিপনন বিভাগে চাকুরির সুবাদে প্রায় ৩৫টি জেলায় (থানা-উপজেলা সহ) ভ্রমণের সময় দেখেছি, যেভাবে জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে আর খাল বিল সেঁচ এবং বিষ দিয়ে মৎস শিকার করা হচ্ছে তাতে শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই যে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের বিদেশ থেকে মিঠা পানির মাছ ব্যাপক হারে আমদানি করতে হবে। কালিবাউশ খুব নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। প্রাকৃতিক পরিবেশে এরা শান্ত ও নিরিবিলি জায়গায় থাকে এবং বাসা বানিয়ে ডিম পারে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো কি শান্ত ও নিরিবিলি থাকার মত অবস্থায় আছে? শুষ্ক মৌসুমে আমাদের দেশের খাল বিল, হাওর বাওর এর অধিকাংশ জায়গা শুকিয়ে যায়। আবার প্রভাবশালীরা নির্বিচারে অবাধে জলাশয় দখল করে ভরাট করছে আবার অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে যত্র-তত্র শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য গিয়ে মিশছে জলাধার গুলোতেই। আর ওইসব বিষাক্ত বর্জ্যের প্রভাবে স্থল ভাগের প্রতিবেশ ও পরিবেশই শুধু নয় জলজ পরিবেশও সমানভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে চরম প্রাকৃতিক জলজ পরিবেশ বিপর্যায় দেখা দিয়েছে। আর যে সব জায়গায় অল্প পানি থাকে সে সব জায়গায় স্থানীয়রা বাঁধ দিয় পানি সেঁচ দিয়ে মাছ ধরে। আবার যেখানে পানি একটু গভীর সে সব জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে মৎস্য শিকারের মহোৎসব চলে। ফলে মিঠা পানির মাছ টিকে থাকার জন্য শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফেলে। এভাবেই বিলুপ্ত হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পনির মাছ। আগামী ভবিষ্যতে আমরা আর বলতে পারব না যে আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালি। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে বিদেশ বিশেষ করে থাইল্যান্ড, চীন ও আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন প্রকার মাছ আমদানি করে চাষ করা হচ্ছে। সেই কবে থেকে তেলাপিয়া সুদূর আফ্রিকা থেকে উড়ে এসে এদেশের আবহাওয়া-জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নিজেদের এমন ভাবে মানিয়ে নিয়েছে যে ওটাকে আর বিদেশি বলার উপায় নেই। বরং ওটার আরো দুইটা প্রজাতি (হাইব্রীড এবং মনোসেক্স) আমাদের মৎস্য বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করে ফেলেছেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কল্যাণে একটা চিন্তা মাথায় এসেছে - আমাদের দেশে যে সকল মৎস বিজ্ঞানী সরকারী, বেসরকারী এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে গবেষণা করছেন তারা যদি একটু আন্তরিক ও সচেতন হন তবে দেশের আনাচে কানাচে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থাকা কালিবাউশ মাছ খুঁজে বের করা যাবে, এটাকে নিয়ে গবেষণা করে এর বংশ বৃদ্ধি ও বৈরি পরিবেশে টিকে থাকার মত জাত উদ্ভাবন করে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া যাবে। সেই সাথে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা হতে শুরু করে প্রতিটি এলাকায় জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। দেশের প্রচলিত মৎস্য সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, প্রয়োজনে সংশোধন করে যুগপোযোগী আইন তৈরি করে কঠোর ভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অপরিণত মাছ খাবার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে, মা মাছ এবং পোনা (বাচ্চা) মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। পারিবারিকভাবেও সবাইকে অধিকতর সচেতন হতে হবে। এ ছাড়াও সবধরনের মিডিয়াকে ব্যবহার করে সরকারি, বেসরকারি, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে গণসচেতনতা যদি তৈরি করা যায় তবে মনে হয় শেষ রক্ষা করা এখনো সম্ভব। থাইল্যান্ডে এক প্রকার কালিবাউশ (ছবির মাছটি) পাওয়া যায়, যা আকারে আমাদের দেশী জাতের চেয়ে বেশ বড়। এটাও মিঠা পানির মাছ। আমাদের দেশি কালিবউশ খুব ধীরে ধীরে বড় হয় বলে সাধারণত কেউ এটার চাষ করতে চায় না। যেহেতু থাইল্যান্ডে ও চীনের কিছু প্রজাতির মিঠা পানির মাছ (কৈ, পুঁটি, সরপুঁটি, পাংগাশ, মাগুর) আমাদের আবহাওয়া ও জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে তাই থাইল্যান্ড থেকে এই প্রজাতির কালিবাউশ আমদানি করে গবেষণা করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে কিছু বিদেশী মাছ আমাদের মিঠা পানির জলাশয়গুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। যেমন, বিগ হেড (অপভ্রংশে ব্রিগেট), সিলভার কার্প, নাইলোটিকা, কার্পু (কমন কার্প), তেলাপিয়া, ঘনে মাছ ইত্যাদি। ব্যাপক গণসচেনতা যদি আন্দলিত করা যায় তবে এখন যে সব মাছ হারিয়ে যাচ্ছে (খলিশা, রয়না/মেনি/ভেঁদা, বাটা/খল্লা, দেশীয় কৈ, দেশীয় পাবদা, দেশীয় সরপুটি, ছোট পুটি, টেংরা, দেশীয় মাগুর, ফলি, চিতল, কাজলি, রিঠা, চাপিলা/ইলশা গোদা, চাঁন্দা, কাকিলা, শোল, টাকি/শাটি , বেলে, গুজ আইর, লম্বা অইর, টেংরা, আইর টেংরা, তারা বাইং/বান) এবং যে সব মাছ প্রায় হারিয়ে গেছে (পিউলি, দেশীয় টাটকিনা/রায়াত, নাপতা, বাঘা অইর, গজার, রাম টেংরা, বুজুরি টেংরা, টাক চান্দা, বাঁশপাতা, ডালকিনা, বুটকিনা, বাছা, গজ বাইং/বান, চেলা/চেলি, রাণী) সে সব মাছ আবার জলাশয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।